উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের EDBN 2401 শিখন ও শিখনযাচাই বিষয়ের ২০২৬ সালের বিএড ২য় সেমিস্টার এর লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ও সমাধান
নিচে প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে ও সুস্পষ্টভাবে গুছিয়ে দেওয়া হলো:
'ক' বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১. শিখন বলতে কী বোঝায়? কার্যকর শিখনের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা ব্যাখ্যা করুন।
- শিখন (Learning): অনুশীলনা ও অভিজ্ঞতার ফলে ব্যক্তির আচরণে যে অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তনের সৃষ্টি হয়, তাকে শিখন বলে।
-
কার্যকর শিখনের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা:
- সহজতরকারী (Facilitator): শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে সহায়কের ভূমিকা পালন করবেন।
- প্রেষণা দান: শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়ায় আগ্রহী ও অনুপ্রাণিত করে তোলা।
- অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি: শ্রেণিকক্ষে ভীতিহীন ও সহযোগিতামূলক শিখন পরিবেশ তৈরি করা।
- বৈচিত্র্যময় শিক্ষণ পদ্ধতি: শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা।
- ব্যক্তিগত বৈষম্য বিবেচনা: প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজস্ব গ্রহণক্ষমতা অনুধাবন করে নির্দেশনা দেওয়া।
২. থর্নডাইকের 'প্রচেষ্টা ও ভুল' মতবাদটি ব্যাখ্যাপূর্ব প্রধান তিনটি সূত্রের কার্যকারিতা উল্লেখ করুন।
- প্রচেষ্টা ও ভুল মতবাদ (Trial and Error Theory): মনোবিজ্ঞানী ই. এল. থর্নডাইক মতে, উদ্দীপক (Stimulus) ও প্রতিক্রিয়ার (Response) মধ্যে সঠিক সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে শিখন ঘটে। ভুল প্রচেষ্টাগুলো বাদ দিয়ে সঠিক প্রতিক্রিয়াটি নির্বাচন করাই হলো এই মতবাদের মূল কথা।
-
প্রধান তিনটি সূত্রের কার্যকারিতা:
- প্রস্তুতির সূত্র (Law of Readiness): শিক্ষার্থী মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলে শিখন দ্রুত ও স্থায়ী হয়।
- অনুশীলনের সূত্র (Law of Exercise): কোনো কাজ বারবার অনুশীলন করলে শিখন দৃঢ় হয় (ব্যবহারের সূত্র) এবং অনুশীলন না করলে তা শিথিল হয়ে যায় (অব্যবহারের সূত্র)।
- ফলাফলের সূত্র (Law of Effect): শিখনলব্ধ ফলাফলে শিক্ষার্থী সন্তোষ বা আনন্দ পেলে শিখন স্থায়ী হয়, আর অসন্তোষ পেলে শিখন দুর্বল হয়।
৩. জ্যাঁ পিয়াজের জ্ঞানমূলক বিকাশ মতবাদের স্তরসমূহ বর্ণনা করুন। শিক্ষাক্ষেত্রে এই মতবাদের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করুন।
-
জ্ঞানমূলক বিকাশের ৪টি স্তর:
- সংবেদন-সঞ্চালনমূলক স্তর (Sensory-Motor Stage, ০-২ বছর): ইন্দ্রিয় ও সঞ্চালনের মাধ্যমে শিশু চারপাশের জগৎ সম্পর্কে শেখে।
- প্রাক-কার্যকরী স্তর (Pre-Operational Stage, ২-৭ বছর): প্রতীকী চিন্তা ও ভাষার ব্যবহার শুরু হয়, তবে চিন্তায় আত্মকেন্দ্রিকতা থাকে।
- মূর্ত-কার্যকরী স্তর (Concrete Operational Stage, ৭-১১ বছর): শিশু মূর্ত বস্তু বা প্রত্যক্ষ বিষয়ের ওপর যৌক্তিক চিন্তা করতে পারে।
- যৌক্তিক-কার্যকরী স্তর (Formal Operational Stage, ১১ বছর ও তদূর্ধ্ব): বিমূর্ত ও কাল্পনিক চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জিত হয়।
- শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্ব: শিক্ষার্থীর বয়স ও বিকাশের স্তর অনুযায়ী কারিকুলাম ও শিখনসামগ্রী প্রণয়নে এটি সরাসরি সাহায্য করে।
৪. শ্রেণিকক্ষে সতীর্থ শিখন কার্যকরভাবে প্রয়োগের উপায় বর্ণনা করুন।
- সতীর্থ শিখন (Peer Learning): সহপাঠীদের পরস্পরকে শেখানোর প্রক্রিয়া।
-
প্রয়োগের উপায়:
- ছোট দল গঠন: মেধা ও দক্ষতার সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করা।
- জোড়ায় কাজ (Pair Work): দুজন শিক্ষার্থীকে জোড়া বানিয়ে নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া।
- ভূমিকা পরিবর্তন: কখনো একজন শিক্ষক এবং অন্যজন শিক্ষার্থী হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।
- শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ: শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ ঘুরে দলগুলোর কাজ পর্যবেক্ষণ করবেন ও দিকনির্দেশনা দেবেন।
৫. অভীক্ষার যথার্থতা হ্রাসের কারণসমূহ শনাক্তপূর্বক প্রতিকারের উপায় নিরূপণ করুন।
-
যথার্থতা হ্রাসের কারণ:
- প্রশ্নপত্রের অস্পষ্টতা ও জটিল ভাষা।
- পাঠ্যক্রমের বহিরাগত বিষয় থেকে প্রশ্ন করা।
- পরীক্ষার সময় অপর্যাপ্ত হওয়া।
- মূল্যায়নে পক্ষপাতিত্ব হওয়া।
-
প্রতিকারের উপায়:
- বিষয়বস্তুর উদ্দেশ্য ও ব্লু-প্রিন্ট (Blue Print) অনুযায়ী প্রশ্ন তৈরি করা।
- সহজ-সরল ভাষায় সুস্পষ্ট প্রশ্ন প্রণয়ন করা।
- নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
৬. পরিমাপ ও মূল্যায়নের পার্থক্য চিহ্নিত করুন। 'মূল্যায়ন একটি ত্রিমুখী প্রক্রিয়া'- ব্যাখ্যা করুন।
- পরিমাণগত বনাম গুণগত (পার্থক্য): পরিমাপ হলো কোনো বৈশিষ্ট্যের পরিমাণগত প্রকাশ (যেমন: পরীক্ষায় ৮০ নম্বর পাওয়া)। অপরদিকে মূল্যায়ন হলো সেই পরিমাপের মূল্য বিচার করা (যেমন: মান বা গ্রেড নির্ধারণ - 'খুব ভালো')।
-
মূল্যায়ন একটি ত্রিমুখী প্রক্রিয়া: ব্লুমের মতে, মূল্যায়ন তিনটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল ইন্টারঅ্যাক্টিভ প্রক্রিয়া:
- শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য (Educational Objectives)
- শিখন অভিজ্ঞতা (Learning Experiences)
- আচরণগত পরিবর্তন/যাচাই (Behavioral Change/Evaluation)
৭. স্ব-মূল্যায়ন বলতে কী বোঝায়? স্ব-মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করুন।
- স্ব-মূল্যায়ন (Self-Assessment): শিক্ষার্থী নিজ শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া ও অগ্রগতির মান নিজেই বিচার বা পর্যবেক্ষণ করাকে স্ব-মূল্যায়ন বলে।
-
প্রয়োজনীয়তা:
- আত্মসচেতনতা বাড়ায় এবং নিজের দুর্বলতা ও শক্তি চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
- স্বায়ত্তশাসিত বা স্ব-পরিচালিত শিখনে উৎসাহিত করে।
- আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং নিজের ভুল সংশোধন করার সুযোগ দেয়।
৮. প্রতিফলন অনুশীলন বলতে কী বোঝায়? প্রতিফলন শিখন চক্রটি ব্যাখ্যা করুন।
- প্রতিফলন অনুশীলন (Reflective Practice): কোনো কাজ সম্পন্ন করার পর তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা, বিশ্লেষণ করা এবং ভবিষ্যতে কিভাবে আরও উন্নত করা যায় তা নির্ধারণের চর্চা।
-
গিবসের প্রতিফলন শিখন চক্র (Gibbs' Reflective Cycle):
- বর্ণনা (Description): কী ঘটেছিল?
- অনুভূতি (Feelings): কাজের সময় কী চিন্তাভাবনা/অনুভূতি ছিল?
- মূল্যায়ন (Evaluation): অভিজ্ঞতাটি ভালো না খারাপ ছিল?
- বিশ্লেষণ (Analysis): পরিস্থিতিটির পেছনে কী কারণ ছিল?
- উপসংহার (Conclusion): আর কী করা যেত?
- কার্য পরিকল্পনা (Action Plan): ভবিষ্যতে আবার এমন পরিস্থিতি এলে কী করা হবে?
'খ' বিভাগ (সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন)
৯. গঠনকালীন ও সমষ্টিগত মূল্যায়নের পার্থক্য নিরূপণ করুন।
- গঠনকালীন মূল্যায়ন (Formative): শিখন চলাকালীন পরিচালিত হয় (যেমন: ক্লাস টেস্ট, কুইজ)। এর মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে গঠনমূলক ফিডব্যাক দিয়ে শিখনে উন্নতি ঘটানো।
- সমষ্টিগত মূল্যায়ন (Summative): নির্দিষ্ট কোর্স বা মেয়াদ শেষে পরিচালিত হয় (যেমন: বার্ষিক পরীক্ষা)। এর উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের অর্জিত ফলাফলের ভিত্তিতে গ্রেড বা সনদ দেওয়া।
১০. ভূমিকা অভিনয় পদ্ধতি বলতে কী বোঝায়?
- ভূমিকা অভিনয় (Role Play): এমন একটি শিক্ষণ পদ্ধতি যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কোনো চরিত্র বা পরিস্থিতি রূপায়ণের মাধ্যমে তা অনুধাবন করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা, সামাজিক সচেতনতা এবং সহানুভূতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।
১১. শ্রেণিকক্ষে পোস্টবক্স পদ্ধতি প্রয়োগের উপায় বর্ণনা করুন।
-
পোস্টবক্স পদ্ধতি (Postbox Method):
- শ্রেণিকক্ষে একটি বক্স বা বাক্স (পোস্টবক্স) রাখা হয়।
- পাঠ সংক্রান্ত প্রশ্ন, দ্বিধা বা প্রতিক্রিয়া শিক্ষার্থীরা কাগজে লিখে না লুকিয়ে সেই বক্সে জমা দেয়।
- শিক্ষক ক্লাসের শেষে বা নির্দিষ্ট সময়ে বাক্স থেকে কাগজগুলো বের করে উত্তর দেন বা আলোচনা করেন। এটি লাজুক শিক্ষার্থীদের মনের দ্বিধা কাটাতে দারুণ কার্যকর।
১২. নৈর্ব্যক্তিক পদ্ধতির সুবিধা-অসুবিধাসমূহ উল্লেখ করুন।
-
সুবিধা:
- অতি দ্রুত ও সহজে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা যায়।
- মূল্যায়ন সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয় (শিক্ষকের ভালো লাগা/মন্দ লাগার প্রভাব পড়ে না)।
-
অসুবিধা:
- শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি, প্রকাশভঙ্গি ও সৃজনশীলতা পরিমাপ করা যায় না।
- অনুমানের ভিত্তিতে (Guessing) ভুল উত্তরও সঠিক হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
১৩. পর্যবেক্ষণ বলতে কী বোঝায়? পর্যবেক্ষণের প্রকারভেদ উল্লেখ করুন।
- পর্যবেক্ষণ (Observation): লক্ষ্যভিত্তিক ও পরিকল্পিত উপায়ে কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা আচরণ মনোযোগ সহকারে দেখে তথ্য সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া।
-
প্রকারভেদ:
- অংশগ্রহণমূলক (Participant) ও অংশগ্রহণহীন (Non-participant) পর্যবেক্ষণ।
- নিয়ন্ত্রিত (Controlled) ও অনিয়ন্ত্রিত (Uncontrolled) পর্যবেক্ষণ।
- প্রোথোক্ষ (Direct) ও পরোক্ষ (Indirect) পর্যবেক্ষণ।
১৪. আদর্শ বিচ্যুতি বলতে কী বোঝায়? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করুন।
- আদর্শ বিচ্যুতি (Standard Deviation): পরিসংখ্যানের এমন একটি পরিমাপ যা নির্দেশ করে উপাত্তের মানগুলো তাদের গড় মান থেকে গড়ে কতটা দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
- উদাহরণ: কোনো একটি শ্রেণির ৫ জন শিক্ষার্থীর গণিতের প্রাপ্ত নম্বর যথাক্রমে ৫, ৫, ৫, ৫, ৫ হলে গড় ৫ এবং আদর্শ বিচ্যুতি ০ (কারণ কোনো বিচ্যুতি নেই)। কিন্তু প্রাপ্ত নম্বর ১, ৩, ৫, ৭, ৯ হলে গড় ৫ কিন্তু আদর্শ বিচ্যুতি ২.৮৩, যা নির্দেশ করে মানগুলো ছড়িয়ে রয়েছে।
১৫. কেন্দ্রীয় প্রবণতা কী? কেন্দ্রীয় প্রবণতার পরিমাপসমূহ উল্লেখ করুন।
- কেন্দ্রীয় প্রবণতা (Central Tendency): উপাত্তের কোনো একটি মাঝামাঝি কেন্দ্রীয় মানের দিকে পুঞ্জীভূত বা একত্রিত হওয়ার ঝোঁককে কেন্দ্রীয় প্রবণতা বলে।
-
পরিমাপসমূহ:
- গড় (Mean)
- মধ্যক (Median)
- প্রচুরক (Mode)
১৬. শ্রেণিকক্ষে মাইন্ড ম্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহারের সুফল বর্ণনা করুন।
- মাইন্ড ম্যাপিং (Mind Mapping): মূল ভাবনার চারপাশে শাখা-প্রশাখা এঁকে ছক আকারে তথ্য চিত্রায়িত করা।
-
সুফল:
- জটিল বিষয়বস্তু সহজে অনুধাবন ও দ্রুত মনে রাখতে সাহায্য করে।
- শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিমূর্ত চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়।
- পাঠ পর্যালোচনা (Revision) ও নোটিং তৈরিতে সময় সাশ্রয় হয়।
