মানবাধিকার কাকে বলে? বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকার ও অধিকার বিষয়ক ধারা গুলো লিখ

 মানবাধিকার কাকে বলে? বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকার ও অধিকার বিষয়ক ধারা গুলো লিখ

মানবাধিকারের সংজ্ঞা

​মানবাধিকার হলো মানুষের জন্মগত ও স্বাভাবিক এমন কিছু মৌলিক অধিকার, যা কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং পূর্ণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। বর্ণ, লিঙ্গ, জাতীয়তা, ধর্ম, ভাষা বা অন্য কোনো পরিচয়নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষ সমানভাবে এই অধিকারগুলো পাওয়ার অধিকারী। জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর 'সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র' (UDHR)-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধিকারগুলোর স্বীকৃতি দেয়।

​বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত ধারা

​বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) মানবাধিকারের সাধারণ চেতনা এবং তৃতীয় ভাগে (মৌলিক অধিকার) নাগরিকদের জন্য বলবৎযোগ্য অধিকারগুলোর উল্লেখ রয়েছে।

​১. রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি (দ্বিতীয় ভাগ)

​এগুলো সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য না হলেও রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও মানবাধিকার সুরক্ষার মূল ভিত্তি:

  • ​ধারা ১১ (গণতন্ত্র ও মানবাধিকার): প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে এবং মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে।
  • ​ধারা ১৫ (মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা): জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ (অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা), কর্মসংস্থান, বিশ্রাম ও সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
  • ​ধারা ১৭ (অবৈতনিক ও বাধ্যতামূক শিক্ষা): নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

​২. মৌলিক অধিকারসমূহ (তৃতীয় ভাগ)

​সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এগুলো আদালতে বলবৎযোগ্য (নাগরিকের এই অধিকার ক্ষুণ্ন হলে ধারা ৪৪ ও ১০২ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট করা যায়):

  • ​ধারা ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা): সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
  • ​ধারা ২৮ (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য): কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।
  • ​ধারা ২৯ (সরকারি নিয়োগলাভে সুযোগের সমতা): সকল নাগরিকের জন্য সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতা থাকবে।
  • ​ধারা ৩১ (আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার): আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না।
  • ​ধারা ৩২ (জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ): আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা ব্যক্তি-স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
  • ​ধারা ৩৩ (গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষা কবচ): বিনা কারণে কাউকে গ্রেপ্তার রাখা যাবে না এবং আইনজীবীর সাথে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
  • ​ধারা ৩৫ (বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ): আইন না ভেঙে বিচার করা যাবে না, এক অপরাধের জন্য দুই বার শাস্তি দেওয়া যাবে না এবং নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • ​ধারা ৩৬ (চলাফেরার স্বাধীনতা): জনস্বার্থে যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র মুক্তভাবে চলাফেরা ও বসবাসের অধিকার।
  • ​ধারা ৩৭ (সমাবেশের স্বাধীনতা): শান্তিপূর্ণভাবে ও অস্ত্র ছাড়া সমবেত হওয়ার অধিকার।
  • ​ধারা ৩৮ (সংগঠন করার স্বাধীনতা): কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার।
  • ​ধারা ৩৯ (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা): প্রতিটি নাগরিকের চিন্তা, বিবেক, বাক্-স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।
  • ​ধারা ৪০ (পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা): যোগ্যতা সাপেক্ষে যেকোনো আইনসংগত পেশা, ব্যবসা বা বাণিজ্য পরিচালনার অধিকার।
  • ​ধারা ৪১ (ধর্মীয় স্বাধীনতা): প্রতিটি নাগরিকের যেকোনো ধর্ম পালন, প্রচার বা গ্রহণের স্বাধীনতা।
  • ​ধারা ৪২ (সম্পত্তির অধিকার): আইন দ্বারা নির্ধারিত শর্তে সম্পত্তি অর্জন, ভোগ ও হস্তান্তরের অধিকার।

Catagories